Monday, 29 January 2018

ফোড়া

#ফোড়া
পাছার বাম পাশে দেশী বরই সাইজের একটা ফোড়া হয়েছে। ব্যথার ঠেলায় কোথাও দুই মিনিটও বসতে পারিনা।এর ভিতর আজ গরীব বলে উঠতে হয়েছে লোকাল বাসে, আজ যদি এই ফোড়া আমার পাছায় না হয়ে কোন মন্ত্রীর পিছনে হত তাহলে তিনি সেটা বিরোধী দলের চক্রান্ত বলে চালিয়ে দিতেন, এই নিয়ে দেশের সব পত্রিকা টিভি চ্যানেল গুলোতে খবর ছাপানো হত, টিভি স্ক্রীনের হেডলাইন হত :-
"ওমক মন্ত্রীর পশ্চাদাংশে কুমড়া সাইজের ফোড়া হয়েছে, এতে বিরোধী দলের হাত রয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে, এমন বেদনা শুধু উনার একার না এটা পুরো জাতির বেদনা.. আমাদের টিভি চ্যানেল এর পক্ষ থেকে তার সুস্থতা কামনা করি"
সংসদে হয়ত শোক দিবস পালনের প্রস্তাব দেয়া হত... তারপর স্পীকার বলতেন... হা যয় যুক্ত হয়েছে হা যয় যুক্ত হয়েছে অতএব দাবিটি পাশ করা হইল
অত:পর বিরোধী দল এহেন দাবী প্রত্যাখান করে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করত।
কিন্তু আজ মন্ত্রী না বলে কেউ আমার এই ফোড়ার খোজ খবর রাখেনা।
পাশের সিটেই এক মহিলা বসেছে তিনি বাম হাতে একটা দামী টিস্যু পেপারের বক্স ধরে রেখেছেন আর ডান হাত দিয়ে একটা টিস্যু দিয়ে নাক চেপে রেখেছেন অথচ কোথাও কোন গন্ধ নেই।
মহিলা যে বিশাল বিত্তশালী সেটা তিনি তার পোশাক পরিচ্ছেদ, ব্যবহার আর তার আইফোন সেভেন প্লাস দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন আমার মত ফকিন্নি টাইপ পাব্লিকদের।
উনার টিস্যু থেকে দারুন এক সুগন্ধ বের হচ্ছে ইচ্ছে করছে হাত বাড়িয়ে বলি আফা গো.. ও আফা..দেন না একটা টিস্যু পেপার আমিও ঘ্রান নি, কিন্তু না তা করা যাবেনা। গরীব হতে পারি কিন্তু ভিক্ষুক তো না। নিজের ভিতরে বড়লোকের একটা ভাব আনলাম, তাকে বললাম এই যে ম্যাম একটু সরে বসেন ঐদিকে। আপনি এত বড় সিট রেখে আমার দিকে সরে আসছেন কেন? কথাটা একটু জোরেই বলে ফেললাম সবাই আমাদের দিক তাকালো। মহিলাটি এবার টিস্যু মুখ থেকে সরিয়ে বলল - আমি তো আমার সিটেই আছি আপনার সিটে তো নেই। আরে আপনি তো আচ্ছা মহিলা- নিজের এই ড্রাম সাইজের শরীরটা নিয়ে শুধু তো আপনার সিটেই নেই আমার সিটের একটা অংশও আপনি নিয়ে রেখেছেন আবার বড়বড় কথা বলছেন কথা শেষ হবার আগেই সিট থেকে একটু লাফিয়ে উঠলাম বাসের ঝাকুনিতে...একদম ফোড়ার উপর কেউ যেন একটা গুতা দিল এমন মনে হল জানটা বেরিয়ে যাবার উপক্রম। মা গো বলে চিল্লায় উঠলাম।
এদিকে মহিলা আমার দিকে শকুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল - আমি কি আপনার বাবার টাকা খেয়ে ড্রাম হয়েছি? আপনার এত মাথাব্যথা কেন? আর আপনার ভাল না লাগলে ও পাশে অনেক সিট আছে ওখানে গিয়ে বসেন, সুন্দরী মেয়ে দেখলে শুধু কথা বলার ধান্দা বের করেন তাই না?
ফোড়ার উপর এত ব্যথা লেগেছে যে কি বলব সেটাই খুঁজে পাচ্ছিনা, মেজাজ হারিয়ে বললাম- আসছেন তো সারা গায়ে মেক আপ মাইরা, পাতিলের মত কালা মুখটা সাদা করছেন.. নিজেরে কি আপনি নায়িকা ভাবেন নাকি! ড্রামের মত শরীর নিয়ে নিজে ঝামেলায় আছেন আবার অন্য মানুষরেও ফেলতে লোকাল বাসে উঠছেন, ফালতু মেয়ে মানুষ কোথাকার। অন্য সিটে গিয়ে বসলাম। এমনিই আজকে চুয়ান্নতম চাকুরীর ভাইবা তার মধ্য এমন কান্ড করে বসল এই মহিলা! অবশ্য এতে আমার দোষও কম না তারপরেও মহিলারে একশ একটা অভিশাপ দিলাম। মহিলা আর আমি একই জায়গায় নেমে পড়লাম।
আমি একটা চায়ের দোকানে এসে দাঁড়ালাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মেজাজ ভাল হয়ে গেল, আধা কাপ চা শেষ না হবার আগেই মাথার উপর কি যেন পড়ল। উপরে চেয়ে দেখি বুড়ো একটা কাকের পশ্চাদাংশ মিসাইলের মত আমার মাথার দিকে তাক করা, কাক টা এবার বাসের ঐ মহিলার মত আমার দিকে তাকিয়ে কা কা করতে করতে চলে গেল। পানি দিয়ে আন্দাজে ধুয়ে নিলাম একটা ছেড়া পত্রিকা দিয়ে মাথাটা মুছে নিলাম। ভাইবা রুমে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছি, একুশ নম্বরে সিরিয়ালে আমার ডাক পড়ল। রুমে ঢুকেই শালা আমি তো অবাক!! এ দেখি বাসের সেই মহিলা মস্ত বড় চেয়ারে বসে আছে, আমাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে গেল তার। ঢোক গিলে অনেক কস্টে নিজেকে স্বাভাবিক করলাম, অনিচ্ছাবশত সালাম দিলাম, উনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাত কড়মড় করতে করতে বললেন বসুন। পাছাড় ফোড়া নিয়ে বসতে ভয় পাচ্ছিলাম তারপরেও বসে পড়লাম। উনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম - ম্যাম শুভ সকাল। উনি বললেন - শুভ কিনা সেটা একটু পরেই বোঝা যাবে।আমি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম উনার দিকে। এবার উনি ভাইবা নেয়া শুরু করলেন।
ম্যাম: আপনার নাম কি?
আমি: বোরাহান উদ্দীন মিথুন
ম্যাম:বোরহান নামের অর্থ কী?
আমি: ভাগ্যবান, প্রমান (এটা বলতে গিয়ে কেন জানি নিজের উপর নিজেরই রাগ হচ্ছিল)
ম্যাম: আর মিথুন নামের অর্থ কী?
আমি: মিথুন নামের অর্থ- জোড়া।
ম্যাম:চাদের রাজধানীর নাম কী?
আমি: জানা নেই।
ম্যাম: ওডি এর লেখক কে?
আমি: মনে এসেও মনে পড়ছে না, বার বার মাথা চুলকাতে লাগলাম। তারপর ম্যামের মুখের দিকে এতিমের মত তাকিয়ে রইলাম।
ম্যাম: ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করুন -
"আজ বাসের মধ্য এক ভদ্র ও সম্মানিত মহিলাকে এক ইতর ছেলে গায়ে পড়ে অপমান করেছে "
আমি: In a bus today a gentle and honorable lady has been insulted by a lousy boy in the way of officiously (ভুল বললাম নাকি সঠিক বললাম আল্লাহ মালুম, ম্যামের দিকে তাকিয়ে রইলাম উনার এক্সপ্রেশন দেখার জন্য সঠিক নাকি ভুল হয়েছে এটা দেখার জন্য)
ম্যাম: আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন, ভুল বলেছি তাই নয়তো আমাকে নিজের মুখে ইতর ঘোষনা করার ব্যাপারটি নিয়ে উনি পৈচাশিক আনন্দ পাচ্ছেন এই ভেবে হাসছেন। বোর্ডে যান গিয়ে ঐ ইকুয়েশনটা সলভ করুন, সময় পাবেন ১ মিনিট। ইউর টাইম স্টার্টস নাউ..
আমি: এই ম্যাথ ইকুয়েশন আমি আমার বাপের জন্মেও দেখিনাই, হাবিজাবি একটা লিখতে যাচ্ছিলাম অনেক ভেবে তখন ই উনি বললেন আপনার সময় শেষ, চেয়ারে এসে বসুন। নিজেকে জাতির সেরা গাধা মনে হচ্ছিল এতদিন এলাকার সেরা গাধা মনে হলেও আজ জাতীয় গাধা মনে হচ্ছে, চুপচাপ চেয়ারে এসে বসলাম
ম্যাম:আপনার দাদার খালাতো বোনের ননদের ভাসুর আপনার কী হয়?
আমি: ইচ্ছে করছিল বলতে.. ম্যাম আপনার কাছে ব্যাঙের ইমোজি হবে? কিন্তু প্রশ্নের উত্তর বের করতে মনোযোগ দিলাম..ভাবতেই ভাবতেই উনি বললেন, আপনার কি আমাদের কোম্পানি সম্পর্কে কোন ধারনা আছে?
আমি: এবার আমার চোখমুখ বেশ খানিকটা উজ্জ্বল হয়ে গেল, বললাম - জ্বী ম্যাম...আমি জানি। এটা একটা বদনা কোম্পানি, আপনাদের কাজ স্বল্প ও মুনাফাযোগ্য বদনা বাজারে সেল করা যাতে স্বল্প আয়ের মানুষেরাও কম দামে কিনতে সক্ষম হয়।
ম্যাম: আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন- আপনার মত বে- আক্কেল লোক ভাইবা দিতে কেন আসে সেটা আমার মাথায় ঢোকে না, একটা কোম্পানিতে ভাইবা দিতে আসলে সেই কোম্পানি সম্পর্কে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে আসতে হয় সেই কমন সেন্সটা আপনার নেই! আর হ্যা এটা কোন বদনা কোম্পানি না, এটা একটা প্লাস্টিক প্রোডাক্ট তৈরিকারী কোম্পানি।
আমি: ঠোট দুটো ফাক করে শুধু বললাম - ও
ম্যাম:আপনার একাডেমিক রেজাল্ট তো দেখছি খুব ভাল কিন্তু কান্ড জ্ঞান, অন্যান্য বিষয়ে দেখছি আপনার অবস্থা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি টাইপের। প্রশ্ন ফাস করে রেজাল্ট ভাল করছিলেন নাকি?
আমি: না ম্যাম, একদম না। আমি জীবনেও প্রশ্ন ফাস করিনাই, শুধু এক্সামের আগেরদিন রাতে একটা সাজেশন দিত স্যারেরা সেটা পড়ে যেতাম কিন্তু কোনদিনও প্রশ্ন ফাস করিনাই।
ম্যাম:আপনার ভাইবা রেজাল্ট বিশে শুন্য। আপনি যেতে পারেন।
একটা সালাম দিয়ে উঠে আসছিলাম তখনই পিছন থেকে ম্যাম ডাক দিয়ে বললেন... এই যে আপনি বসুন আর একটু।
ম্যাম: আপনাকে একটা সুযোগ দিচ্ছ... এটাতে পাশ করলেই আপনার চাকরি কনফার্ম।
আমি: আমার আবেগে কান্দা চইলা আসল, আবেগ সংযত করে মাথা নেড়ে বললাম আমি প্রস্তুত।
ম্যাম: আপনি প্রমাণ করুন- দুনিয়ার সেরা সুন্দরী আমি.. যদি আপনি সুন্দরভাবে প্রমান করে আমাকে খুশী করতে পারেন তাহলে আপনি পাশ।
আমি: মনে মনে সেই খুশি হইলাম। চেয়ার ছেড়ে উঠে টেবিলের উপর দু হাত দিয়ে ভর দিয়ে ম্যামের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম :-
আপনার এই নাকটা বাশির মত..যেই নাকের জন্য আলেকজান্ডার তাবৎ পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে...মনে হচ্ছে কোন চিত্রশিল্পী খুব যত্ন নিয়ে আপনার এই নাক একে দিয়েছেন, আপনার কানে থাকা ঐ কানের দুলে যেন এক অদৃশ্য নীলা পাথরের ছোঁয়া রয়েছে যাতে অন্ধকারেও পথ খুঁজে পাবে কোন পথহারা যোদ্ধা, অত:পর সে আপনাকেই পুজো দেবে। আপনার ঐ অজগরসম চুলে নিজেকে হারিয়ে খুঁজতে চেয়েছিল শত বর্ষীয়ান কোন সাধু..যিনি শুধু আপনার ই অপেক্ষায় ছিল, তার বুকে থাকা আজন্মের তৃষ্ণার খোরাক আপনার এই চুল, আপনার দুচোখে যেন পৃথিবীর সমস্ত মায়া এসে ভর করেছে, এক নিমিষেই সে গ্ল্যাডিয়েটরকেও মায়ার জালে ফেলে দিকহারা করতে পারবে...আপনার এই হলদে ফর্সা রুপে যেন হারিয়ে খোজে তাবৎ মমহাপুরুষ, আপনি সম্রাজ্ঞী.. আপনি দেবী..যার পূজো দেবার জন্য দুনিয়া পাড়ি দিতেও কুন্ঠবোধ করবেনা কোন মহা পুরুষ । আপনার দেহের এই সুন্দর আকার আপনাকে আরো অনিন্দ্য সুন্দরী করে তুলেছে...একদম ঠিকঠাক এই আকার আপনাকে এক নতুন রুপ দিয়েছে... আপনি স্থুল নন আবার বেশি চিকনও নন..আর এই সব ব্যাপারটাই আপনাকে করে তুলেছে দুনিয়ার সেরা সুন্দ্রী। (ম্যাম আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন... এবার পরিস্থিতি সামলে আমাকে বললেন... আপনি বাইরে যেয়ে অপেক্ষা করুন, রেজাল্ট একটু পরই পেয়ে যাবেন।
আমি বাইরে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এর মাঝে একটা লোক এসে আমাদের বিস্কুট আর চা দিয়ে গেল। বিকাল নাগাদ রেজাল্ট দেয়া হল, তাতে আমার নাম নেই। পোস্ট ছিল মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট হেড। আমি চলে আসতে যাচ্ছি তখন একজন এসে আমার হাতে একটা পেপার দিলেন, সেটা ছিল জয়েনিং লেটার, আর ছোট একটা কাগজে লেখা ছিল-
মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে হেড পদে চাকুরী না দিতে পারার জন্য দু:খিত,তবে আপনি আমাদের বদনা দোকানে গিয়ে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে সেল করতে পারবেন পার্ফেক্ট ভাবে সেটা আপনাকে দেখে বুঝেছি। আপনার মত এত সুন্দর করে কেউ আমাদের বদনার প্রোডাক্ট বিক্রি করতে পারবেনা, আপনি রাজি থাকলে কাল থেকেই কাজে জয়েন করতে পারেন। স্যালারির ব্যাপারটা ম্যানেজার সাহেবকে বলে দিয়েছি, উনি যথেষ্ট ভাল আ্যমাউন্ট ই দিবেন।
এমডি
ফোড়ার ব্যথাটা হুট করেই বেড়ে গেল, কাল থেকে বদনা বেচতে বের হব...এই বদনা... এই বদনা বলে হাক ছাড়তে হবে। অন্তত বেকার তো থাকতে হবেনা। এই দেশে মন্ত্রীর ফোড়ার কথা সবাই ভাবলেও আমার মত বেকারের ফোড়ার কথা ভাবার লোক কই! আমার ব্যথা আমার ই।
লেখা: Borhan uddin

No comments:

Post a Comment