Monday, 29 January 2018

বিয়েনামা

Written By: Asif Mahmud
(১)
-কাল সকালে রেডি থাকিস, মেয়ে দেখতে যেতে হবে।
মা এসে আমার রূমে রিমাইন্ডার দিচ্ছেন। এ নিয়ে চারবার হয়ে গেছে। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখলে স্টপ না করে স্নুজ বাটনে ক্লিক করলে যেমন একটু পরপর আবার বেজে উঠে, মা-ও ঠিক তেমন আচরণ করছেন।
-হ্যাঁ ঠিক আছে। আপনি যান, আমি রেডি থাকব ইনশাআল্লাহ।
-এত রাত হয়ে গেল, এখনো ঘুমাইলি না, সকালে উঠে তো ঢুলবি ঘুমে।
মায়েদের এই এক ডায়লগ, এ জীবনে কতবার যে শুনেছি হিসেব নেই। অবশ্য আমি বাবা থেকেও বহুবার এই কথাটিই শুনেছি। বাবার ধারণা আমি যেহেতু রাতে দেরিতে ঘুমাই, সেহেতু আমি ভার্সিটি গিয়ে ক্লাসে ঘুমে টলতে থাকি, কিংবা ঘুমিয়েই পড়ি। বাবার ধারণা অবশ্য আংশিক সত্য। আমি অনেকদিন ই চেয়ারম্যান স্যারের সেমিকন্ডাকটর ক্লাসে ঢুলু ঢুলু ভাব নিয়ে ক্লাস করেছি। অনেকদিন ক্লাস মিস ও করেছি। তাই বড়দের কথা যে একেবারে ফেলনা নয় তাও কিন্তু ঠিক, কিন্তু তবুও যখন বলে তখন রাগ লাগে। সত্য কথা তেতো কিনা।
-আরে আমি উঠতে পারব আপনি গিয়ে ঘুমান।
-আমি তোর মশারি টাঙ্গিয়ে দিয়ে যাচ্ছি, কাঁথা আরেকটা লাগলে বলিস, ঠাণ্ডা আছে এখানে অনেক। আর কয়েল দিব?
মশারি দেয়ার পরও কয়েলের প্রয়োজনীয়তা টা কি আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।
-আপনি এক কাজ করেন, আপনি গিয়ে শুয়ে পড়েন। কিছু করা লাগবে না এখন আর। আমি শুয়ে যাব।
মায়ের মুখ দেখে মনে হল আমি মশারি ভালমত বিছানার চারপাশে খুঁচে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে উনাকে গুড নাইট বলা পর্যন্ত উনি যাবেন না। অগত্যা বসা থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
-গুড নাইট বলতে হবে?
শুনে মা হাসতে হাসতে চলে গেলেন, আর আমি বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে নিতে গিয়ে দেখি ফোন নেই। মায়ের কারসাজি বুঝতে আর বাকি রইল না। মা ভালমতই জানে আমি ফোন পাশে থাকলে সহজে ঘুমুব না, তাই আগে ভাগেই ফোন সরিয়ে ফেলেছে। মায়ের উপর রাগের পাশাপাশি একটা স্নেহমিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
(২)
সকালে মায়ের চিৎকার চেঁচামেচি তে ঘুম ভেঙে গেল।
-কয়টা বাজছে তোর কোন খবর আছে? মানুষ কেমনে দশটা পর্যন্ত ঘুমায়! দুনিয়ার মানুষ ঘুম থেকে উঠে অর্ধেক কাজকর্ম শেষ করে ফেলেছে।
মায়ের কথা শুনে ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। নিজেকেই নিজে বিশ্বাস হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে পাঁচ-ছ মিনিট আগে ফজর পড়ে শুয়েছি। এর মধ্যে দশটা বেজে গেছে! চোখ ডলতে ডলতে ডাইনিং ক্রস করে বেসিনের দিকে যাচ্ছিলাম, তখনি চোখ পড়ল ঘড়িটায়। আটটা বেজে তিন মিনিট। মা জাতির উপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেল। হায়রে মা! ইচ্ছে করছিল ডাইনিং এই শুয়ে পড়ি, এত স্বাধের ঘুম আমার! যাহোক, বেসিনে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে বসলাম। নাস্তার টেবিলে বাবা বেশ গম্ভীর হয়ে বসা। বোঝাই যাচ্ছে আমাকে বেশ কিছু নতুন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবগত করা হবে। আমি ও বেশ গম্ভীর হয়ে বসে আছি। বাবা গলা খাঁকারি দিলেন। এবার তাঁর স্পিচ শুরু হবে।
-আমরা যাচ্ছি ৬-৭ জন, সেহেতু আমরা বোধহয় একটা গাড়ি নিলে ভাল হয়।
-কি গাড়ি?
-একটা ট্যাক্সি হইলে ভাল হয়।
-ট্যাক্সি কই পাবেন, এখন তো সব সিএনজি।
বাবা আমার দিকে গুলি করে ছাই করে দেয়ার লুক দিলেন, আমি চুপসে গেলাম।
-তোর জামা-কাপড় রেডি আছে?
-আমি শার্ট পড়ে যাবো নাকি পাঞ্জাবি?
-তোর এখনো সেটাও ঠিক নেই? একটা অকেশন, অথচ কোন প্রস্তুতি নাই?
অথচ আমি বাবাকে প্রশ্ন করেছি, আমি শার্ট পড়ব নাকি পাঞ্জাবি, তিনি উত্তরে আমাকে এক দফা শাসিয়ে দিলেন। এটা বাবাদের স্বভাবগত আচরণ। আমি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেতে লাগলাম। বাবা আবার শুরু করলেন।
-মেয়ের তো কেউ মুখ দেখতে পারল না, শেলীরেও পাঠালাম অন্যভাবে একটু চেহার টেহারা দেখা যায় কিনা, কিন্তু সেটাও হল না। একবার কোনভাবে চেহারা দেখতে পারলে আগানো টা ভাল ছিল। এখন হুট করে দেখতে যাওয়া মানে ওয়ান ফুট ফরোয়ার্ড হয়ে যাওয়া।
বলেই বাবা আমার দিকে তাকালেন। বোধহয় আমার থেকে কিছু শোনার অপেক্ষা করছেন।
-চেহারা দেখে কি হবে? আদার সাইড তো ঠিক আছে। মেয়ে পর্দা-টর্দা করে, পড়াশুনাও আছে, ফ্যামিলিও ভাল।
বাবা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন।
-চেহারা দিয়ে কি হবে মানে? চেহারাই তো আসল। ফেইসের সাথে অনেক কিছু রিলেটেড। আমার প্রথম ছেলের বিয়ে, মেয়ে সুন্দর কি অসুন্দর দেখব না?
বাবা এবার কিছুটা উত্তেজিত। আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ খেতে লাগলাম। বাবা এবার নিজেকেই নিজে শান্ত্বনা দিতে লাগলেন।
-ঠিক আছে, যে বিয়ে করবে, তার সমস্যা না থাকলে আমার আর কি বলার আছে?
-বাবা। বিয়ে করছিনা এখনো। আজ কেবল দেখতে যাচ্ছি। আপনাদের পছন্দ ছাড়া বিয়ে করব বলে তো বলিনি।
বাবা বোধহয় কিছুটা কনভিন্সড হলেন এ কথায়। খাওয়ার পর গোসল সেরে রুমে আসার পর মা কোত্থেকে একটা শেভিং মেশিন নিয়ে আসলেন।
-এটা কিসের জন্য?
-দাঁড়ি ছোট কর একটু। এত লম্বা রাখলে কেমন দেখা যায়। জামাইকে জামাইর বাপ মনে করবে বুঝেছিস?
-তাতে কি? আমি তো গিয়ে বলবই ছেলে আমি ই।
-আহারে, তারপরও একটা মানানসই আছে না?
-মা, তোমার এই কাহিনী সেই অনেক আগে থেকে শুনছি। তারা আমার এই দাঁড়ি সমেত আমাকে পছন্দ করলে করবে নয়ত না।
-ঠিক আছে, যা ভাল বুঝিস।
মা একটু মুখ গোমরা মত করলেন। আমি আজ পর্যন্ত নিজে নিজের লুক নিয়ে যতটা না চিন্তিত তার চেয়ে বেশি চিন্তিত আমার মা। ছোটবেলা থেকে আমাকে জিন্সে ভাল ধরবে, শার্ট ইন করলে ভাল লাগবে, হাতে একটা ঘড়ি হলে জম্পেশ হবে এসব থিওরি আমার মায়ের। কিন্তু বরাবরই আমার পছন্দ তাঁর উলটো। তাই মায়ের এই গোমরা মুখ টা দেখে অভ্যাস হয়ে গেছে।
-আচ্ছা শোন, মেয়ের সাথে কথা বলে দেখবি বুঝছিস? ওখানে গিয়ে বোবা হয়ে যাইস না।
-জ্বি বলব।
-আর হ্যাঁ, মেয়ের হাঁটাচলা খেয়াল করবি, কোন দোষ-টোষ আছে কিনা। রোগা মেয়ে না গছিয়ে দেয়।
-মা, আমি নিজের জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছি, গরু কিনতে যাচ্ছি না। কি বলছ এসব?
-তর্ক করিস না, বিয়েতে এসব দেখতে হয়। রোগা মেয়ে বিয়ে করবি নাকি?
-আচ্ছা ধরো, মেয়ের কোন রোগ উপর থেকে যেসব চোখে পড়েনা, এরকম কিছু থাকলে? কিংবা আমার থাকলে? আমারো তো থাকতে পারে, আমিও তো জানিনা। তাহলে এটা গছানো কিভাবে হল। এত কিছু ভাবলে হয়?
মা, কি যেন ভাবলেন অনেকক্ষণ। তারপর চলে গেলেন।
আমি রেডি হয়ে রুম থেকে বের হওয়ার পর বাবা-মা একযোগে আমার দিকে সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন। বাবা-মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে তাঁরা অন্য কিছু বলতে চাইছেন। মা ভেতরের দিকে চলে গেলেন। বাবা আমার কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন,
-তোর কোন অসুখ-টসুখ আছে নাকি রে?
এবার আমার মেজাজ টা গেল তিরিক্ষ্মি হয়ে। চিৎকার করে মা কে ডাক দিলাম, মা দৌড়ে এলেন।
-আপনারা আসলেই অতিরিক্ত করে ফেলছেন। বিয়ের নিকুচি করি, আমি কাল ই ঢাকায় চলে যাচ্ছি।
বলেই পাঞ্জাবি খুলে ফেললাম। এরপর রুমে চলে এলাম। মা এসে আমার পিঠে মালিশ করতে লাগলেন।
-চল বাবা, রেডি হয়ে নে। আর পাঞ্জাবি টা খুলছিস ভাল হয়েছে, ডিপ কালারে ভাল দেখাচ্ছে না। লাইট কোন কালার থাকলে সেটা পর।
অগত্যা হলুদ আর সবুজের মিশ্রিত একটা রঙের পাঞ্জাবি পড়ে আমি, বাবা, দুই কাকা আর এক মামাকে নিয়ে একটা সিএনজি ভাড়া করে আমার হবু শ্বশুর বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম। মা কে সাথে নিলে ভাল হত। মাকে ছাড়া একটা টিশার্ট কখনো পছন্দ করতে পারলাম না, বউ কি পছন্দ করব! কিন্তু মা কেন জানি যেতে চাইলেন না। সিএনজি আনুমানিক আমাদের বাজার পর্যন্ত পৌঁছালে আমি বাবাকে বললাম,
-বাবা, একটা কার নিলে ভাল হত না?
-বিয়ে করতে যাচ্ছিস নাকি যে কার নিবি?
-না মানে, একটা পার্সোনালিটির ব্যাপার আছে না। ভাল চাকরিবাকরি করি হিসেবে, একেবারে একটা সিএনজি নিয়ে গেলে কেমন দেখায় বিষয়টা।
বাবা আমার কথায় কিছুটা কনভিন্সড হলেন। বাজারে নেমে একটা কার ভাড়া নিলাম আমরা। কারে বসে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছিলাম, যাক একটা পার্সোনালিটি সম্পন্ন এন্ট্রি হবে ঐ বাড়িতে। কিন্তু আমার পাঞ্জাবির কালার নিয়ে আমি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলাম না। মনের মধ্যে খুতখুত ভাব হচ্ছিল, “যাহ! বাজে দেখাচ্ছে!”
(৩)
কারে চড়ে মেয়ের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে সর্বোচ্চ দশ মিনিট সময় লাগল, এর মধ্যেই বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন। সবাই মিলে ঝাঁকুনি প্রয়োগ করে বাবাকে উঠাতে হল। এবার গাড়ি থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে ইতস্তত করতে লাগলাম। সবাই বের হয়ে যাওয়ার পর জানালা দিয়ে মুখে বের করে আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম, “আব্বু, আমি কি এখন বের হব?”
-তো কি আমরা মেয়ে দেখে চলে যাব?
বাবার উত্তরে লজ্জা পেয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে আসলাম। এদিকে ওদিক থেকে ও বাড়ির লোকজন আমাদের রিসিভ করতে এগিয়ে এল। সবাই এসে হাত মিলিয়ে মোবারকবাদ জানাল। এরপর আমাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। সবাই একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। এক হাজার দর্শকের সামনে মাইক হাতে স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকার মত ব্যাপার এটা খানিকটা। একেকজন একেকরকম প্রশ্ন করতে লাগল। সবার প্রশ্নের ডাইমেনশন অনেকটা একই রকম ছিল, আর সবাইকে দেখতে একইরকম বয়স্ক দেখাচ্ছিল, ফলে আমি মেয়ের বাবা নির্ধারণ করতে অসমর্থ হলাম। এটা আমার আজীবনের ব্যর্থতা। একবার বন্ধুর বিয়েতে গিয়ে বন্ধুর ভায়রা কে তার শ্বশুর ভেবে বেশ খাতিরযত্ন করে শেষমেশ বন্ধুকে এসে বললাম, “তোর শ্বশুরের বেশ খাতিরযত্ন করলাম আজ”
“মানে? আমার তো শ্বশুর বেঁচেই নেই”
সেই দিনের পর থেকে আমি আর কখনো কারো শ্বশুর কে খাতির যত্ন করতে যাইনি।
-বাবা, তো তোমার পরবর্তী প্ল্যান কি? পড়ালেখা বা চাকরির ব্যাপারে?
অবশেষে আমি মেয়ের বাবা খুঁজে পেতে সক্ষম হলাম। তাঁর এই প্রশ্নে আমি সহজ সরল উত্তর দিলাম।
-এর চেয়ে ভাল স্যালারির কোন চাকরি খোঁজার ইচ্ছে আছে আপাতত।
লোকটা পড়ালেখার ব্যাপারে কেন জানতে চাইল বুঝতে পারলাম না। এমএসসি পাশ করেছি, আর কত পড়ব, চাকরি করছি, বিয়ে করতে এসেছ্ বিয়ে শাদি করে সংসার এই তো জীবন। আর কি! তবে তিনি আমার উত্তরে যথেষ্ট সন্তুষ্ট হতে পারলেন বলে মনে হয়না। তার চেয়ে বোধহয় আমি পিএইচডি করতে আমেরিকা যাব বললে তিনি খুশী হতেন। বলি, তাহলে আপনার মেয়েকে খাওয়াবে কে? আর অত টাকা তো আমার বাবার নেই যে আবার পিএইচডি এর জন্য আমেরিকা পাঠাবে।
মানুষ চতুর্দিক থেকে শুধু প্রশ্ন করছে, মনে হচ্ছে কোন সংবাদ সম্মেলনে আছি। উপর্যুপরি প্রশ্নের পাথরে বিক্ষত হয়ে যাচ্ছি। এদিকে নাস্তার ট্রে সামনে পড়ে আছে, এতক্ষণে বোধহয় সব নাস্তা ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ হাত ও বাড়াচ্ছে না, আর আমি তো পাত্র, তাই যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করছি। আর এদিকে মেয়েকে তো বের ই করছে না। আমি ভেবেছিলাম বোধহয় এমন হবে, আসলাম, দেখলাম, চলে গেলাম। কিন্তু না, এসেছি দুঘণ্টা হয়ে গেছে, এখনো তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি যে তারা মেয়েকে বাইরে আনবে কিনা। মেয়ের বাবা বারবার ভেতরে যাচ্ছেন আবার বাইরে আসছেন। মেয়ের দুই ভাই আমার দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে একটা হুংকার দেখতে পাচ্ছি, “তুই মানুষ সলিড তো? নাইলে বোন বিয়া দিমু না” আমিও নিজেকে খুবই নিষ্পাপ ভাবে উপস্থাপন করতে চাইলাম। এতে কেউ সন্তুষ্ট হল কিনা জানিনা তবে আমি যথেষ্ট সন্তুষ্ট হচ্ছিলাম নিজের পারফরম্যান্সে।
কিছুক্ষণ পর লম্বা ঘোমটা সমেত মেয়েকে এনে আমার সামনের সোফায় বসানো হল। আমার মাথা নিচু হয়ে গেল। ঘড়ির কাটা ঘুরে ঘুরে এপাশ থেকে ওপাশে চলে যায়, আমি লজ্জায় তার চেহারার দিকে তাকাতে পারিনা। সে আমার দিকে তাকিয়েছে কিনা তাও বুঝতে পারছিনা। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে যাওয়ার পর, সবাই বলল, “ওর সাথে কথা বল, কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে করতে পার”। এবার আমি বেশ বেকায়দায় পড়ে গেলাম, লজ্জায় তো তাকাতেই পারছিনা, এর উপর প্রশ্ন করব! আমি মাথা না উঠিয়েই বললাম, “না, আমি কি জিজ্ঞেস করব। মেয়েও চুপ করে আছে” বাবা, এগিয়ে গিয়ে মেয়ের হাতে একটা প্যাকেট গুজে দিলেন, সোনার চেইন ছিল বোধহয়। এর মধ্যেই মেয়েকে ভেতরে চলে যাওয়ার জন্য বলা হল। আমার মাথায় বাজ পড়ল! আরে, আমি তো দেখলাম ই না। সাথে সাথে মাথা উঠিয়ে দেখি মেয়ে ততক্ষণে উঠে ওপাশ ফিরে গেছে। দেখতে দেখতে সে অন্দরমহলে চলে গেল। আমার মনের মধ্যে তখন “অপরিচিতা” গল্প পাঠ শুরু হয়ে গেছে! আমি হাসফাঁস করতে লাগলাম। বাবার চেহারা কিছুটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, বোধহয় মেয়ে তাঁর পছন্দ হয়েছে। সবাই এর মধ্যে বেশ মিশে গেছে একে অপরের সাথে। আর এদিকে আমার ভেতরে কম্পন শুরু হয়ে গেছে। নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। কি করলাম? এবার এই সমস্যার সমাধান কি! কথায় বলে নিয়ত গুণে বরকত। আমি ই বলেছিলাম চেহারা দেখে কি হবে? তাই বলে চেহারা টাই দেখা হল না। নিজেকে বসে বসে বেশ খানিকক্ষণ দুষলাম।
এরপর আমরা সবাই উঠলাম, যাওয়ার বেলায় হবু শ্বশুর আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি দোয়া চেয়ে বের হয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। আমার মাথা ততক্ষণে ঘুরতে শুরু করে দিয়েছে। গাড়ি ছেড়ে দেয়ার পাঁচ মিনিটের সময় আমি বাবাকে বললাম, “বাবা, আমি মেয়ের চেহারা টা দেখতে পারিনি” এই কথার সাথে সাথে ড্রাইভার হার্ড ব্রেক কষল। বাবা চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম বড় করে ধপ করে সিটে শুয়ে পড়লেন।
(চলুক না ;-) )

No comments:

Post a Comment